সাইবার অপরাধের ধরন বদলেছে: সংখ্যা আর আশঙ্কা বেড়েই চলছে

সাইবার অপরাধের ধরন বদলেছে: সংখ্যা আর আশঙ্কা বেড়েই চলছে

সাইবার অপরাধের ধরন বদলেছে: সংখ্যা আর আশঙ্কা বেড়েই চলছে

সাইবার অপরাধের ধরন বদলেছে: সংখ্যা আর আশঙ্কা বেড়েই চলছে

উন্নত প্রযুক্তি, ইন্টারনেট সহজলভ্য এবং নজরদারির অভাবে দেশে সাইবার অপরাধ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। সময়ের বিবর্তনে অপরাধের ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে। সাইবার ক্রাইম তদন্ত কর্মকর্তারা ঘটনাটিকে ‘যৌনবৃত্তি’ বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তাদের মতে, এ ধরনের অপরাধ দেশে একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও কিছু অপরাধ বা নির্যাতনের খবর পাওয়া যায়, তার অধিকাংশই জনগণের দৃষ্টির আড়ালে থাকে।

সামাজিকতার জন্য,  লজ্জা বা  জানাজানি হয়ে যাওয়ার ভয় ,  নিজের অপ্রত্যাশিত ও অযাচিত ছবি অন্যের কাছে শেয়ার না হয়ে যাক সে চাহিদা থেকে এবং হামলা ও অত্যাচারের হুমকির সম্মুখীন হওয়ার ভয়  থেকেই এ বিষয়ে মামলাও করতে যান না অনেকেই ।  আবার অনেকে মামলা করার ইচ্ছে থাকলেও মামলার করার ব্যাপারটি জানেননা । এভাবেই বেড়ে চলছে সাইবার অপরাধ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। কিছু ব্যক্তিগত ছবি দিয়ে ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে তাকে হয়রানি করা হচ্ছে। ছবিগুলো তার তোলা এবং সে কখনো কাউকে দেয়নি। দাবিকৃত টাকা পরিশোধ না করায় ছবিগুলো ইনস্টাগ্রামে আপত্তিকর ক্যাপশন দিয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। নিরুপায় সেই ছাত্রী পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের সাথে যোগাযোগ করেছেন। এ বিষয়ে জিডি করার পর প্রযুক্তিগত তথ্য অনুসন্ধানে আত্মীয়ের এক বন্ধুর নাম বেরিয়ে আসে।

তদন্তে জানা যায়, সেই ছাত্রী কোনো কাজে আত্মীয়ের ল্যাপটপে তার ই-মেইল লগইন থেকে লগ আউট করতে ভুলে গেছেন। অভিযুক্তরা বন্ধুর ল্যাপটপ ব্যবহার করে সেই ছাত্রীর ই-মেইলে প্রবেশ করে। তার ব্যক্তিগত কিছু ছবি সংগ্রহ করে। আর তা দিয়ে শুরু হয় ব্ল্যাকমেইলিং।

এমন পরিস্থিতিতে সোমবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব যৌন সহিংসতা বিরোধী দিবস। তবে দিনটি আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রাক্কালে হওয়ায় সরকারি-বেসরকারিভাবে দেশের কোথাও উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মসূচি নেওয়া হয়নি।

পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন সাইবার অপরাধের শিকার নারীদের অভিযোগ গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তা প্রদানের জন্য কাজ করছে। ১৬ নভেম্বর ২০২০ থেকে চলতি বছরের ৩১জানুয়ারি পর্যন্ত তাদের ফেসবুক পেজে মোট ৫০ হাজার ৩০৪ টি মেসেজ এসেছে, হটলাইন নম্বরে ৭৮ হাজার ২৩৪ টি ফোন কল এবং ৮৮৯ টি ই-মেইল এসেছে। অনেকেই একাধিক মাধ্যমে বা একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন। নিবন্ধিত সেবাপ্রত্যাশীর সংখ্যা ৫০ হাজার ৩০৪ জন।

সেবা-প্রার্থীদের মধ্যে,৩৪২৪০ জন মহিলা সাইবারস্পেসে হয়রানি-সম্পর্কিত সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১২ হাজার ৭৭৯ জন পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে এবং পরবর্তীতে আইনি ব্যবস্থা নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন। মোট ২০ হাজার ৯৫৩টি অভিযোগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাকি ৫০৮টির অভিযোগ প্রক্রিয়াধীন।

ভুয়া ফেসবুক আইডি, আইডি হ্যাক, ব্ল্যাকমেইলিং, মোবাইল হয়রানি, আপত্তিকর কন্টেন্ট ছড়ানোসহ বিভিন্ন সাইবার অপরাধ সংঘটিত হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভিকটিমের ছবি, মোবাইল নম্বর, বাড়ির ঠিকানা, এনআইডি বা কোনও যোগাযোগের বিবরণ পোস্ট বা মন্তব্য করে সোশ্যাল মিডিয়ায় (আসল বা সম্পাদিত) ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে আইনের আশ্রয় নেওয়ার শিকারের সংখ্যা দিন দিন কমছে। ২০১৮ সালের জরিপে যেখানে অভিযোগকারীর সংখ্যা ছিল ৬১ শতাংশ, ২০২৩ সালে তা ২০.৮৩ শতাংশে নেমে এসেছে। আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বিদ্যমান আইন সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব ২৪ শতাংশ, দ্বিতীয় অবস্থানে আছে বিষয়টি গোপন রাখতে ২০ শতাংশ এবং তৃতীয়ত আইনি ব্যবস্থা নিয়ে উল্টো হয়রানির ভয়ের কথা জানিয়েছেন ১৮ শতাংশ ভুক্তভোগী।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে অভিযোগ, ফলাফল উদ্বেগজনক। জরিপ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগীদের মধ্যে অভিযোগকারীর সংখ্যা দিন দিন কমছে। জরিপে আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার সাতটি কারণ পাওয়া গেছে। আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হল ভুক্তভোগীদের ২৪ শতাংশ জানে না কীভাবে আইনি ব্যবস্থা নিতে হয়। ২০ শতাংশ বিষয়টি গোপন রাখার জন্য দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এবং তৃতীয়ত ১৮ শতাংশ ভুক্তভোগী আইনি পদক্ষেপ এবং বিপরীত হয়রানির আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।

আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরও ৮০ শতাংশ ভুক্তভোগী সন্তুষ্ট নয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, যারা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে অভিযোগ করেছেন তাদের ৮০ শতাংশই অভিযোগের ফলাফল নিয়ে অসন্তুষ্ট। তবে ২০২২ সালের জরিপে আগের বছরের তুলনায় অনেক উন্নতি হয়েছে। তবে ওই বছরের জরিপে ৩৭.৬৯ শতাংশ ভুক্তভোগী এ বিষয়ে মন্তব্য করেননি। বিপরীতে, এই জরিপে সন্তুষ্টি-অসন্তোষ নিয়ে মন্তব্য না করার হার ছিল৪.৪৫।

ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের এক কর্মকর্তা  বলেন, প্রতি সপ্তাহে এ সংক্রান্ত ২ থেকে ৩টি মামলা আসে, যার ভুক্তভোগী নারী। কিন্তু এই সংখ্যা খুবই কম। অধিকাংশ নারী লোকচক্ষুর ভয়ে, সংসার ভাঙার ভয়ে মামলা করেননা। আর এ বিষয়ে কেউ বলতেও চায় না। ফলে এ ধরনের অপরাধ দিন দিন বেড়েই চলেছে। এক্ষেত্রে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে নারীদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

আরও পড়ুন

সাইবার ক্রাইম থেকে নিজেকে রক্ষা করার কিছু উপায়

    Leave a Reply

    Your email address will not be published.

    X