আত্মীয়তার বন্ধন

আত্মীয়তার বন্ধন

আত্মীয়তার বন্ধন

আত্মীয়তার বন্ধন

ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আত্মীয়তার গুরুত্বের প্রতি গুরুত্বারোপ করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে কিছু চাও এবং রক্ত সম্পর্কীয় সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন কর।’ অর্থাৎ রক্ত সম্পর্কীয় বন্ধন ছিন্ন করো না। (আননিসা-১) ।

আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা শুধু অপরাধই  নয়, সামাজিক ব্যাধিও বটে। যা একটি সুস্থ সমাজ ও সুন্দর পরিবেশ বিনির্মাণ এবং মানবতাবোধ জাগ্রত করার অন্তরায়। স্বাভাবিক মানবজীবন, সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্বর্গীয় সমাজ প্রতিষ্ঠায় বাধা। ফলে ইসলাম আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। এটি লঙ্ঘনকারীদের কঠোর সতর্কতা ও শাস্তি ঘোষণা করেছে। আল-কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যারা আল্লাহর অঙ্গীকার দৃঢ় করার পর ভঙ্গ করে, আল্লাহ যে সম্পর্ক বজায় রাখতে আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে ওরা ওই সব লোক যাদের জন্য রয়েছে  অভিশাপ এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন আজাব।’ (সুরা আরবাদ আয়াত ২৫)।

আল্লাহ আরও বলেন,ক্ষমতা লাভ করলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করবে এবং রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। এসব যারা করবে, তাদের প্রতিই আল্লাহ অভিসম্পাত করেন, অতঃপর তাদের বধির ও দৃষ্টিশক্তিহীন করেন।’ (সূরা মুহাম্মদ : ২২, ২৩)।

আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই কুরআনের সতর্কবাণী ও নির্দেশ। আত্মীয়তার ভালো সম্পর্ক নষ্ট হলে তা মানুষকে কবিরা গোনাহ বা বড়   পাপের দিকে নিয়ে যায়। এই স্বর্গীয় সম্পর্ক ক্রমশই  ভেঙে যায়। এটি একটি দুঃখজনক সত্য যে মানুষ আত্মীয়তার এই সম্পর্কের প্রতি খুব উদাসীন। মানুষ মনে করছে সম্পর্ক নষ্ট করলে কিছু যায় আসে না। কিন্তু আল্লাহর হুকুম হলো-

وَاتَّقُواْ اللّهَ الَّذِي تَسَاءلُونَ بِهِ وَالأَرْحَامَ

আর আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের সাহায্য চাও এবং আত্মীয়তার ব্যাপারে সতর্ক থাক।’ (সূরা নিসা : আয়াত ০১)

আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা মহাপাপ। যারা সম্পর্ক নষ্ট করে তাদের উপর আল্লাহ নিজেই অভিশাপ দেন। পৃথিবী তাদের উপর নেমে আসে বেদনা, কষ্ট ও বেদনা নিয়ে। আল্লাহ বলেনঃ

فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِن تَوَلَّيْتُمْ أَن تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ – أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَعُمَ اللَّهُمَ أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَعُمْ عْمَى أَبْصَارَهُمْ

‘ক্ষমতা পেলে হয়তো সংসারে কলহ সৃষ্টি করবে, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। আল্লাহ  তাদের অভিশাপ দেন। দেন। (এমনকি) এরপর তাদের বধির ও দৃষ্টি শক্তিহীন করে দেন।’ (সুরা মুহাম্মাদ : আয়াত ২২-২৩)

কিন্তু আত্মীয়তার বন্ধন মজবুত হলে জান্নাতি সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এমন নির্দেশনা এসেছে কোরআনে। আল্লাহ তায়ালা তার ইবাদত করার কথা বলছেন। শিরক থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। আর এ আয়াতে আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

وَاعْبُدُواْ اللّهَ وَلاَ تُشْرِكُواْ بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالجَنبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللّهَ لاَ يُحِبُّ مَن كَانَ مُخْتَالاً فَخُورًا

‘আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তার সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করো না এবং সদয় হও-

  •  পিতামাতার সঙ্গে,
  •  আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে,
  •  ইয়াতিমদের সঙ্গে,
  • মিসকিনদের সঙ্গে,
  •  প্রতিবেশির সঙ্গে,
  • আর মুসাফিরের সঙ্গে ,
  • নিজের সঙ্গী -সহচর এবং
  • পথচারীদের সঙ্গে।
  • আর তোমাদের ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে; তাদের সঙ্গে অর্থাৎমালিকানাভুক্ত দাস-দাসীদের সাথে । নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা দাম্ভিক-অহংকারীকে ভালোবাসেন না।’ (সুরা নিসা : আয়াত ৩৬)

এ আয়াতে আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার নির্দেশনা বিশেষভাবে দেওয়া হয়েছে। একটু অন্যভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, যাদের ভালো ব্যবহার করতে বলা হয়, তারা (বাবা-মা, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন) আগে থেকেই আপনার।

হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে-

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে তার উচিত আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা।’ (বুখারী)

কোরান-সুন্নাহর নির্দেশ হলো আত্মীয়তার সম্পর্ক সদা বজায় রাখা।  এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে ভালো ব্যবহার করাই কোরান-সুন্নাহর নির্দেশ। সুসম্পর্ক বজায় রেখে পৃথিবীতে বেহেস্তি সম্পর্ক গড়ে তোলা।

আত্মীয়তার বন্ধন নষ্ট করার কঠোর পরিণামও হাদীসের একাধিক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হল-

১. হযরত যুবাইর ইবনে মুতায়িম রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (বুখারী ও মুসলিম)

২.হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,‘আত্মীয়তা আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে বলল- আমাকে বিচ্ছিন্ন করা থেকে আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনার সময় এটা। আল্লাহ বলেন- ‘হ্যাঁ’, তবে তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তোমার সঙ্গে যারা সম্পর্ক বজায় রাখবে আমি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখব এবং যারা তোমাকে ছিন্ন করবে আমি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করব?’ এ কথা শুনে আত্মীয়তা বলল- ‘অবশ্যই’। তখন আল্লাহ বললেন, তোমার জন্য এরূপই করা হবে। (বুখারি ও মুসলিম)

আরও পড়তে

পরোপকারে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে

এটা বিশ্বাসী মুসলমানের কর্তব্য, যেহেতু যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবে আখেরাতে তাদের সাথে আল্লাহ সম্পর্ক রাখবেন। আর যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করবে না; আল্লাহ তাদের সাথে সম্পর্ক রাখবেননা। তাই একে অপরের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা মানুষের ঈমানি দায়িত্ব।

পৃথিবীতে আত্মীয়-স্বজনের সাথে স্বর্গীয় সুসম্পর্ক তৈরি হোক। আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে আত্মীয়তার এই সুসম্পর্ক বজায় রাখার তাওফীক দান করুন। আমীন।

    Leave a Reply

    Your email address will not be published.

    X