ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে গুঁড়িয়ে দেয়া ১২ শতাধিক বাড়ির মালিক বেশিরভাগই মেওয়াতি মুসলিম

ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে গুঁড়িয়ে দেয়া ১২ শতাধিক বাড়ির মালিক বেশিরভাগই মেওয়াতি মুসলিম

ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে গুঁড়িয়ে দেয়া ১২ শতাধিক বাড়ির মালিক বেশিরভাগই মেওয়াতি মুসলিম

ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে গুঁড়িয়ে দেয়া ১২ শতাধিক বাড়ির মালিক বেশিরভাগই মেওয়াতি মুসলিম

ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর ১২ শতাধিক ভবন ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া  হয়েছে। এসব ভবনের অধিকাংশই মুসলমানদের মালিকানা বলে জানা গেছে। গত মাসে শুরু হওয়া সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর থেকে হরিয়ানা সরকার নুহ জেলার ১১টি শহর ও গ্রামে মোট ১২৮৮ টি ভবন ভেঙে দিয়েছে। ৭২.১ একর জমির মোট ৩৭ টি বসতি ভেঙে ফেলা হয়েছে। আর এসব ভবনের অধিকাংশই ছিল মুসলমানদের বসবাস।মসজিদে আগুন দেওয়া হয়। সেখানে গুলি হয়েছে। একজন ইমাম মারা গেছেন। আহত হয়েছেন আরও তিনজন।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভেঙে যাওয়া ভবনগুলো হল নুহ, নলহার, পুনহানা, তরু, নাঙ্গল মোবারকপুর, শাহপুর, আগন, আদবর চক, নলহার রোড, তিরঙ্গা চক এবং নাগিনা এলাকায়। এই বিষয়ে, হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী মনোহর লাল খাট্টারের বিশেষ দায়িত্বের কর্মকর্তা (ওএসডি) জওহর যাদব দাবি করেছেন যে সহিংসতার সাথে জড়িতদের 1 আগস্ট স্থানীয় পঞ্চায়েতের সাথে বৈঠকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর পরে তাদের ভবনটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে । যাদব দাবি করেছেন যে সমস্ত নিয়ম মেনে ভবনগুলি ভেঙে ফেলা হয়েছে। এই অভিযানের আগে তারা আইনি মতামতও নেন এবং সব নথি খতিয়ে দেখেন। এদিকে, ভেঙে পড়া অনেক ভবনে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বসবাস করছে। উল্লেখ্য যে এর আগে নুহ জেলার এসপি নরেন্দ্র বিজোর্নিয়া দাবি করেছিলেন যে হরিয়ানায় অবৈধভাবে বসবাসকারী বেশ কিছু রোহিঙ্গা ৩১ শে জুলাইয়ের সহিংসতার সাথে জড়িত ছিল। এসব রোহিঙ্গারা পাথর ছুড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ অবস্থায় পুলিশ সুপার বলেন, তারা অপরাধীদের চিহ্নিত করে তালিকা তৈরি করেছেন। আর অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে প্রমাণের ভিত্তিতে। পুলিশের সন্দেহভাজন তালিকায় অন্তত ১৭ জন রোহিঙ্গা রয়েছে বলে জানা গেছে। উল্লেখ্য যে, ৩১ জুলাই, হরিয়ানার নুহ এবং গুরুগ্রাম জেলায় একটি ধর্মীয় মিছিলে কথিত বাধার কারণে একটি অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। হরিয়ানার বজরং দলের কর্মী মনু মানেসার সেখানকার নুহ এবং গুরুগ্রাম জেলায় সহিংসতার জন্ম দিয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে ভিওয়ানিতে দুই মুসলিম যুবককে খুনের ঘটনায় পলাতক মনু। মনু ভিডিওটি পোস্ট করে দাবি করেছেন যে তিনি এই ধর্মীয় মিছিলে উপস্থিত থাকবেন। এই অবস্থায় গুরুগ্রাম আলওয়ার হাইওয়েতে এই যাত্রা বন্ধ করে দেন কয়েকজন। এরপর মিছিলে পাথর ছোড়া হয়। সরকারি-বেসরকারি যানবাহনে পাথর ছোঁড়া হয়। এ সময় প্রায় আড়াই হাজার মানুষ পাশের একটি শিব মন্দির প্রাঙ্গণে আশ্রয় নেয়। পরে সন্ধ্যায় গুরুগ্রাম সোহনা হাইওয়েতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বেশ কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। ঘটনার জেরে বেশ কয়েকটি বাড়ি ও দোকানে আগুনও দেওয়া হয়। মন্দিরেও হামলা চালানো হয়। পুলিশের ওপর ইটপাটকেল বর্ষণ করে। সংঘর্ষে দুই হোমগার্ডসহ অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহত হোম গার্ডদের নাম নীরজ ও গুরুসেবক। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত দুই শতাধিক। পরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে অন্যত্র। রাতে ৫৭ নম্বর সেক্টরের মসজিদে হামলা হয়। মসজিদে আগুন দেওয়া হয়। সেখানে গুলিতে একজন সহ  আহত হয়েছেন আরও তিনজন।

মিও মুসলিম কারা?

ভারতের হরিয়ানা অঞ্চলে বসবাসকারী মুসলমানরা, যেখানে এই সপ্তাহের শুরু থেকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়েছে তারা মেওয়াতি বা মিও মুসলিম নামে পরিচিত। হরিয়ানার নুহ জেলা, যেখানে দাঙ্গা শুরু হয়েছিল, সেখানে ৭৯ % মুসলিম।

কয়েক বছর আগে পর্যন্ত নূহ জেলার নাম ছিল মেওয়াত। দাঙ্গা নূহ থেকে  প্রতিবেশী গুরগাঁওয়েও ছড়িয়ে পড়ে। দাঙ্গায় হিন্দু ও মুসলমান উভয়েই ছয়জন নিহত হয়, আহত হয় ৫০ জনেরও বেশি।

কিন্তু মেওয়াত শুধু হরিয়ানায়ই ছিল না, এর বিস্তৃতি শুরু হয়েছিল পূর্বে মথুরার শেষ প্রান্ত থেকে হরিয়ানার মেওয়াত জেলা এবং রাজস্থানের ভরতপুর ও আলওয়ার জেলা পর্যন্ত। এই সমগ্র অঞ্চলের আদিবাসীদের বলা হয় মেওয়াতি, যেখান থেকেই মেওয়াতি বা মিও মুসলিম নামটি এসেছে।

যদিও হরিয়ানার মেওয়াত জেলা, এখন নুহ নামে পরিচিত, কেন্দ্রীয় নীতি কমিশনের ২০১৮ সালের রিপোর্টে দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জেলা হিসাবে নামকরণ করা হয়েছে।

মিও মুসলিমরা প্রাচীনকাল থেকে আরাবল্লি পর্বত অঞ্চলে বসবাসকারী একটি উপজাতি সম্প্রদায়। দ্বাদশ শতাব্দীতে  ইসলামি সুফি সাধকগণ তাদের সংস্পর্শে আসেন। তাদের মাধ্যমে ইসলামের প্রতি আনুগত্য ও ইসলাম গ্রহণ করে।

আরও পড়ুন

মণিপুরে সহিংসতা ও রক্তপাত থামছেই না, মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৫

হিজাব আন্দোলনের সেই প্রতবাদি তাবাসসুম দ্বাদশের পরীক্ষায় পুরো রাজ্যে প্রথম

“খানজাদা রাজপুতরা ১৩৭২ থেকে ১৫২৭ সাল পর্যন্ত মহম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বকালে এই অঞ্চল শাসন করেছিল। তবে, মেওয়াটের তৎকালীন রাজা, হাসান খান মেওয়াতি, ১৫২৭ সালে বাবরের সাথে খানওয়ার যুদ্ধে নিহত হন,” “সম্রাট বাবর ধর্মের ভিত্তিতে আমাদের পূর্বপুরুষদের, বিশেষ করে রাজা হাসান খান মেওয়াতির সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। বিনিময়ে, বাবর তাকে আলওয়ার অঞ্চলের বিশাল অঞ্চলের শাসনভার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু রাজা হাসান রাজি হননি। ফলস্বরূপ, ১৫২৭ সালের ১৫মার্চ, রাজা হাসান খান মেওয়াতী বর্তমান রাজস্থানের ভরতপুরে খানওয়ারের যুদ্ধে বাবরের সাথে যুদ্ধ করেন। কিন্তু তিনি নিজে ১২০০০ অশ্বারোহী সহ যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন, তবুও বিদেশী হানাদারদের সাথে যোগ দেননি।” এই হচ্ছে  মেওয়াতি বা মিও মুসলিমদের সাহসিকতার ইতিহাস।

    X