ব্রিকসে যোগদানে হোঁচট বাংলাদেশেরঃ সমর্থন মেলেনি ভারতের

ব্রিকসে যোগদানে হোঁচট বাংলাদেশেরঃ সমর্থন মেলেনি ভারতের

ব্রিকসে যোগদানে হোঁচট বাংলাদেশেরঃ সমর্থন মেলেনি ভারতের

ব্রিকসে যোগদানে হোঁচট বাংলাদেশেরঃ সমর্থন মেলেনি ভারতের

BRICS হল ২০০৬ এর সেপ্টেম্বরে গঠিত হওয়া পাঁচটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশের জোট । ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা। সদস্য দেশগুলোর নামের প্রথম অক্ষর অনুসারে এই জোটের নামকরণ করা হয়েছে। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগদানের আগে ব্লকটি ‘BRIC’ নামে পরিচিত ছিল।

পাঁচ দেশের জোট ব্রিকসের এবারের শীর্ষ সম্মেলনের শেষ দিনে ছয়টি দেশকে সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যার মধ্যে বাংলাদেশ নেই। ছয় মাস ধরে বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্তি নিয়ে জোর বিতর্ক ছিল। প্রভাবশালী দেশ চীনেরও জোরালো সমর্থন ছিল। নির্বাচনের আগে, সরকার পশ্চিমা চাপে ব্রিকস সদস্যপদ পেতে আগ্রহী এবং প্রত্যাশিত ছিল। ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্রিকসের সদস্য হওয়া একটি নতুন মাত্রা যোগ করত। সেসব প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে হোঁচট খেয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

কিন্তু কারো কারো মতে শেষ মুহূর্তে আবেদন করেছিল বাংলাদেশ। তদুপরি, এই ধরনের ফোরামে যোগদানের জন্য যে ধরনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা করা দরকার তা করেনি। হয়তো, এবার বাংলাদেশ সদস্যপদ পাওয়ার কথা ভাবেনি।

দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে তিন দিনব্যাপী ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন শেষ হয়েছে। ১৫ তম শীর্ষ সম্মেলনে, ছয়টি দেশকে জোটে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এই ছয়টি দেশ হলো সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, ইথিওপিয়া ও আর্জেন্টিনা। আগামী বছরের ১ জানুয়ারি’২৪ থেকে তাদের সদস্যপদ কার্যকর হবে। অর্থাৎ পাঁচটি দেশের BRICS এবার এগারোটি দেশের জোটে পরিণত হবে।

৪০ টিরও বেশি দেশ এবার ব্রিকসে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে ২২টি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে যোগ দিতে আবেদন করেছে।

সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ব্রিকস সম্প্রসারণ ঘোষণা করা হলেও নীতি, নিয়ম ও পদ্ধতি নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতানৈক্য ছিল। এসব বিষয়ে সবাই একমত হওয়ার পর অবশেষে গতকাল ছয়টি দেশের অন্তর্ভুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা গত জুনে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কর্মসূচির ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন। এরপর ব্রিকসে যোগদানের বিষয়টি জোরালোভাবে উঠে আসে। দুই শীর্ষ নেতার বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেন, আগস্টে বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হতে পারে। যাইহোক, সেই বৈঠকের পরে, অর্থাৎ ১৪ জুনের পরে, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিকস সদস্যতার জন্য আবেদন করে।

জোটের অন্যতম শক্তিশালী দেশ চীনের জোরালো সমর্থন বাংলাদেশের সদস্যপদ নিয়ে গত দুই মাস ধরে আলোচনায় রয়েছে। এমনকি সম্মেলনের ফাঁকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠকেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, চীন বাংলাদেশকে ব্রিকসের সদস্য হতে সহায়তা করবে।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনের বৃহত্তর স্বার্থে বাংলাদেশ হয়তো শেষ পর্যন্ত সমর্থন পায়নি। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বেশ কয়েক বছর ধরে বৈরী  সম্পর্ক চলছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অত্যন্ত খারাপ। আর পাঁচটি ব্রিকস দেশের মধ্যে পশ্চিমাদের সঙ্গে ভারত ও ব্রাজিলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকাও বাংলাদেশকে শুরুতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। ব্রিকস জোটের বর্তমান সদস্যরাও চায় নতুন কেউ যেন তাদের জোটে প্রভাবশালী না হয়। সম্মেলনের আগে দেশগুলো এ বিষয়ে সতর্ক ছিল। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, ভারত ও ব্রাজিলের সমর্থন পায়নি বাংলাদেশ। আর দক্ষিণ আফ্রিকাও ছিল নীরব।

কূটনৈতিক সূত্র বলছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর চাপে রয়েছে সরকার। ব্রিকস সদস্যপদকে সরকারি নীতিনির্ধারকরা পশ্চিমা চাপের প্রতিকূল হিসেবে দেখেছেন। তাই চলতি বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই এই জোটের সদস্য হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। বাংলাদেশ জুনে সদস্যপদ পেতে আবেদন করে।

তবে কূটনৈতিক সূত্র জানায়, সাধারণত কেউ এ ধরনের ফোরামে যোগ দেওয়ার জন্য আবেদন করেন না। কারণ সদস্য দেশগুলোকে নতুন দেশ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। ফলে সেসব দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানদের কাছে বাংলাদেশ থেকে চিঠি পাঠানোর পাশাপাশি সেসব দেশে বিশেষ দূত পাঠানোর চেষ্টাও করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ আবেদন না করে সদস্য দেশগুলোর প্রধানদের সঙ্গে কোনো ধরনের সুপারিশ বা তদবির করেনি।

সূত্রের দাবি, ব্রিকসে যোগ দিতে বাংলাদেশের চেয়ে চীন বেশি আগ্রহী। চীন ও রাশিয়া পশ্চিমা আধিপত্য খর্ব করতে এই জোট সম্প্রসারণ করতে চায়। বাংলাদেশ সদস্যপদ না পেলেও সদস্যপদ পাওয়া ছয়টি দেশে চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্বে ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ ধীরে ধীরে বাড়বে।

এবার না হলেও পরের বার বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্যপদ পাবে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে সেক্ষেত্রে ভারতের সমর্থন অপরিহার্য। তারা বলেন, আঞ্চলিক ভারসাম্যের কারণে ভারত হয়তো বাংলাদেশকে জোরালো সমর্থন দেয়নি। কারণ ভারত ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক এখন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বৈরী। তাই তারা চায় না বাংলাদেশ ব্রিকসে চীনকে সমর্থন করুক। একই সঙ্গে ভারতের অন্যতম মিত্র যুক্তরাষ্ট্র চায় না বাংলাদেশ চীনের বলয়ে প্রবেশ করুক। একইভাবে বিষয়টি নজরে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক মিত্র ব্রাজিলের। তবে এখানে বড় সমীকরণ হতে পারে এশিয়ান অঞ্চলে চীনের আধিপত্য নিয়ে ভারতের আপত্তি। কারণ ছয়টি নতুন সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে তিনটি চীন ও রাশিয়ার কাছাকাছি।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জোটের সদস্য হওয়ার জন্য কিছু মানদণ্ড প্রস্তাব করেছিলেন। গতকাল শেষ মুহূর্তে জোটের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। চলতি বছরের ব্রিকস সম্মেলনের শুরু থেকেই জোটের সম্প্রসারণই আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।

ভারতের একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক হর্ষ পান্ত সম্প্রতি জোটের ভারসাম্য সম্পর্কে একটি নিবন্ধে লিখেছেন, কিন্তু ভারতীয় নীতিনির্ধারকেরা ব্রিকসে সমমনা দেশগুলোকে চীনের স্বাগত জানানোর ব্যাপারে সতর্ক। .

ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ব্রিকস-এর পরিধি বাড়ানোর প্রশ্নে জোটের অন্যতম সদস্য ভারতের সরকারি বিবৃতি হল, জোটে নতুন দেশকে স্বাগত জানাতে হবে। তবে জোটের মধ্যে ‘আঞ্চলিক ভারসাম্য’ রক্ষা করাও খুব জরুরি। ব্রিকস-এ চীনের প্রভাবাধীন আরও দেশের প্রবেশে জোটের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য যাতে নষ্ট না হয় সেদিকেও ভারত সতর্ক।

আরও পড়ুন

বেশীরভাগ মানুষই মনে করেন ভুল পথে যাচ্ছে বাংলাদেশ

ভারত নিশ্চিত করতে চায় যে ব্রিকস চীনের দিকে বেশি ঝুঁকে না পড়ে। এ কারণেই চীনের অনুমোদন নিয়ে যেসব দেশ BRICS-এর সদস্য হতে চায় তাদের ব্যাপারে ভারত সতর্ক মনোভাব নিয়েছে। বাংলাদেশ পুরোপুরি এর মধ্যে পড়ে না বলে মনে করে ভারত । ভারতের পক্ষ থেকে কখনো বলা হয়নি যে বাংলাদেশ সরাসরি ব্রিকসে যোগ দিতে হবে।

যেসব দেশ বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরির ক্ষমতা রাখে তাদেরকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও সেরকম ভূমিকা রাখতে পারবে কি না, সেটাও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

নতুন সদস্যদের নাম ঘোষণা করেন ব্রিকসের বর্তমান চেয়ারম্যান, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঘোষণার সময় রামাফোসার পাশে ছিলেন। ইউক্রেন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কারণে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্মেলনে যোগ দেননি। তার প্রতিনিধিত্ব করেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ।

পাঁচ সদস্য ছাড়াও এই জোটে যোগ দিতে আগ্রহী দেশের প্রতিনিধিসহ বিশ্বের ৫০টি দেশ ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিয়েছে।

    Leave a Reply

    Your email address will not be published.

    X